মহাবিশ্বের অস্তিত্বের কারণ: কেন কিছু আছে, কিছুই নেই কেন?
মানুষের মধ্যে সবসময় একটি প্রশ্ন কাজ করেছে, আমরা কেন আছি? মহাবিশ্ব কেন আছে? কেন কিছু আছে, কিছুই নেই কেন? এই প্রশ্ন কেবল দর্শন নয়, বিজ্ঞানেরও অন্যতম গভীর রহস্য।
বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মহাবিশ্বের অস্তিত্বের রহস্য লুকিয়ে আছে পদার্থ ও প্রতিপদার্থ এর মধ্যে অদ্ভুত এক অসমতার মধ্যে। আমরা প্রতিদিন যে পৃথিবী দেখি। যেমন: গাছপালা, পাহাড়-পর্বত, আকাশ-তারা, এমনকি আমাদের শরীর সবই তৈরি পদার্থ দিয়ে। এই পদার্থ গঠিত হয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দিয়ে,
যেমন: ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন। অন্যদিকে, প্রতিপদার্থ হলো পদার্থেরই উল্টো সংস্করণ। প্রতিটি ইলেকট্রনের বিপরীতে আছে পজিট্রন (যার চার্জ +1, যেখানে ইলেকট্রনের চার্জ -1)। প্রতিটি প্রোটনের বিপরীতে আছে অ্যান্টি-প্রোটন। প্রতিটি নিউট্রনের বিপরীতে আছে অ্যান্টি-নিউট্রন। অর্থাৎ, পদার্থ ও প্রতিপদার্থ একে অপরের প্রতিচ্ছবি, তবে তাদের বৈদ্যুতিক চার্জ বিপরীত।
পদার্থ ও প্রতিপদার্থ একসাথে টিকতে পারে না। যখন তারা মিলিত হয়, সঙ্গে সঙ্গে একে অপরকে ধ্বংস করে ফেলে। সেই সময় উৎপন্ন হয় প্রচণ্ড শক্তি ও গামা রশ্মি। এক কথায়, পদার্থ ও প্রতিপদার্থের সংঘর্ষ হলো একধরনের ক্ষুদ্র বিস্ফোরণ। প্রতিপদার্থের ধারণা প্রথম দেন ব্রিটিশ পদার্থবিদ পল ডিরাক। তিনি কোয়ান্টাম মেকানিক্স নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে দেখেন, কণার বিপরীত কণাও থাকতে পারে। তার এই ভবিষ্যদ্বাণী ১৯৩০ সালে সত্য প্রমাণিত হয়।
আজকের দিনে বিজ্ঞানীরা বড় কণা ত্বরক (যেমন: Large Hadron Collider) ব্যবহার করে কৃত্রিমভাবে প্রতিপদার্থ তৈরি করতে পারেন। তবে প্রতিপদার্থ খুব দ্রুত ধ্বংস হয়ে যায়, তাই এটি মহাবিশ্বে এখন বিরল। তাত্ত্বিকভাবে, মহাবিশ্বের জন্মের সময় বিগ ব্যাং-এ সমান পরিমাণ পদার্থ ও প্রতিপদার্থ তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ ৫০% পদার্থ আর ৫০% প্রতিপদার্থ।
কিন্তু আজ আমরা দেখি, মহাবিশ্ব ভরা পদার্থ দিয়ে। প্রতিপদার্থ কোথায় গেল?
এটাই বিজ্ঞানের বড় রহস্য পদার্থ-প্রতিপদার্থ অসামঞ্জস্য সমস্যা। একটা বিষয় কল্পনা করা যায়। যদি প্রতিপদার্থ বেশি থাকত, তবে মহাবিশ্বে তারাই আধিপত্য বিস্তার করত। তাহলে আমাদের মহাবিশ্ব হতো প্রতি-পরমাণু, প্রতি-অণু দিয়ে গঠিত এক অদ্ভুত জগৎ। শেষ পর্যন্ত, যেটি সংখ্যায় টিকে যায় তাকেই আমরা পদার্থ বলি। অন্যটিকে বলি প্রতিপদার্থ। অর্থাৎ নামগুলো অনেকটাই শর্তসাপেক্ষ। বিজ্ঞানীরা বলেন, বিগ ব্যাং-এর পর প্রথম এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশে প্রচণ্ড সংখ্যক পদার্থ ও প্রতিপদার্থ তৈরি হয়েছিল।
তারা একে অপরকে ধ্বংস করে দেয়। কিন্তু সামান্য পরিমাণ পদার্থ থেকে যায়, যেগুলো আর প্রতিপদার্থের সঙ্গে ধ্বংস হয়নি। আমরা সেই অবশিষ্টাংশ দিয়েই তৈরি। আমাদের পৃথিবী, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র সবই সেই অল্পকিছু টিকে থাকা পদার্থের ফল। ১৯৬৭ সালে সোভিয়েত পদার্থবিদ আন্দ্রেই সাখারভ এই রহস্য ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেন। তিনি তিনটি শর্ত দেন, যেগুলো থাকলে পদার্থ প্রতিপদার্থের উপর আধিপত্য করতে পারে।
এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো C এবং CP লঙ্ঘন। C মানে চার্জ। P মানে parity বা প্রতিসাম্য। সাধারণত কণা ও প্রতিকণা একে অপরের প্রতিচ্ছবি হলেও, কিছু ক্ষেত্রে তারা ভিন্নভাবে আচরণ করে। অর্থাৎ, তারা ১০০% উল্টো নয়। এই ক্ষুদ্র ভিন্নতাই মহাবিশ্বে পদার্থকে টিকে থাকতে সাহায্য করেছে।
বিজ্ঞানীরা স্বীকার করেন, আমরা জানি CP লঙ্ঘন সত্যি আছে। কিন্তু এর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা এখনও পুরোপুরি বোঝা যায়নি। পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করা কঠিন। এ কারণে এখনো এটি কণাপদার্থবিজ্ঞানের বড় রহস্যগুলোর একটি।বর্তমানে বিজ্ঞানীরা নানা উপায়ে এ সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করছেন, যেমন LHC-তে পদার্থ-প্রতিপদার্থের আচরণ পর্যবেক্ষণ করা। মহাশূন্য থেকে অ্যান্টিম্যাটারের চিহ্ন খোঁজা। মহাবিশ্বের প্রাথমিক মুহূর্তের ঘটনা বোঝা।
তাহলে আসলে কেন কিছু আছে, কিছুই নেই কেন?
এখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মহাবিশ্বের জন্মের সময় পদার্থ ও প্রতিপদার্থ সমান ছিল। কিন্তু অতি ক্ষুদ্র এক ভারসাম্যহীনতার কারণে পদার্থ অল্প হলেও বেশি টিকে যায়। প্রতিপদার্থ প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। সেই সামান্য বেঁচে থাকা পদার্থ থেকেই আজকের মহাবিশ্ব গঠিত। অর্থাৎ, আমরা নিজেরাই একটি মহাজাগতিক অসমতার সন্তান। এই প্রশ্ন কেবল বৈজ্ঞানিক নয়, দার্শনিকও। অনেকে বলেন, যদি সত্যিই কিছুই না থাকত, তবে প্রশ্ন করার মতো কেউ থাকত না। মহাবিশ্বের অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে শূন্যতা চিরস্থায়ী নয়।
মহাবিশ্ব কেন আছে, কেন কেবল শূন্যতা নেই।এটি বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় রহস্যগুলোর একটি। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এর উত্তর লুকিয়ে আছে পদার্থ ও প্রতিপদার্থের অদ্ভুত অসামঞ্জস্যে। ক্ষুদ্র পার্থক্যের কারণে পদার্থ টিকে গেছে আর প্রতিপদার্থ প্রায় হারিয়ে গেছে। সেই অল্পকিছু পদার্থ দিয়েই তৈরি আজকের বিশাল মহাবিশ্ব।
সুতরাং আমরা যেদিন রাতের আকাশে তারা দেখি, মনে রাখতে পারি। ওগুলো আসলে মহাবিশ্বের জন্মের প্রথম মুহূর্তের এক অসমতার চমৎকার উপহার।
